রাজ্য

বাঁকুড়া জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে চিঠি পাঠালেন গৌতম মিশ্র।

মোহিত দাস,নিউজ বেঙ্গল ৩৬৫ ডেস্ক, বাঁকুড়া : দায়িত্ব পাওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই বাঁকুড়া জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে চিঠি পাঠালেন উত্তর বাঁকুড়া তথা সারা জেলার অন্যতম স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মুখ গৌতম মিশ্র সেই সঙ্গে মঙ্গলবারই তিনি বিজেপিতেও যোগ দিলেন দুর্গাপুরে শুভেন্দু অধিকারী, বাবুল সুপ্রিয়ো, এস এস আলুযালিযাদের হাত ধরে। তিনি জেলার একজন সর্বজন গ্রাহ্য সমাজকর্মী হিসেবে শ্যামদা নামেই পরিচিত। সোমবার তার এই পদত্যাগ পত্র জেলা তৃণমূল ভবনে জেলা সভাপতি শ্যামল সাঁতরার হাতে পৌঁছে দেন তার অনুগামীরা। গৌতম বাবু তার পদত্যাগপত্র পাঠানোর সাথে সাথে রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন যেমন পড়ে গেছে, তেমনি জেলার মোড়ে মোড়ে, চায়ের দোকানের আড্ডায় চর্চার সঙ্গে জল্পনাও শুরু হয়ে গেছে। তাহলে কি মমতা ব্যানার্জি তৃণমূল দল গঠনের প্রথম দিন থেকে সংগঠনের সদস্য থাকা অভিমানী গৌতম বাবুও  শুভেন্দুর মত তৃণমূলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন? এই জল্পনা উস্কে দিয়ে গৌতম মিশ্র বলেন, আমি নিজেকে একজন রাজনৈতিক কর্মী থেকেও সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করতে বেশি সাবলীল। কিন্তু দল এবং আইপ্যাক টিম আমাকে বড়জোড়া বিধানসভা এলাকায় সংগঠনের কাজ দেখার দায়িত্ব পালন করতে বলেন। দল আমাকে ডাকছে না। এতে আমি অপমানিত ও ব্যথিত হয়ে তৃনমূলের জেলা সাধারণ সম্পাদকের পদ সহ দলের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলাম। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যে তার কাছে জেলার প্রত্যেকটি অঞ্চল থেকে মানুষ দলমত নির্বিশেষে সাহায্যপ্রার্থী হয়ে আসেন। তা কেউ দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার জন্য বা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর পড়াশুনার কাজে। কিংবা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা অথবা অসহায় কোনো পরিবারে জীবিকার সংস্থানের ব্যবস্থা করা । একনিষ্ঠ তৃণমূল কর্মী হিসেবে গত ২২ বছর দলনেত্রীকে অনুসরণ করে রাজনীতি করে গেছেন। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল দল গঠন হওয়ার পর বাঁকুড়া জেলা থেকে যে কজন কংগ্রেস ছেড়ে মমতা ব্যানার্জির হাত ধরে ছিলেন গৌতম বাবু তার অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন। সেদিনের লাল দুর্গ বাঁকুড়ার মেজিয়া শিল্পাঞ্চলে বুক চিতিয়ে সিপিএমের মোকাবিলা করেছিলেন। ১৯৯৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় কংগ্রেস জেলায় সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল। ফলে তৃণমূলের প্রার্থী হতে অনেকেই অনীহা প্রকাশ করে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গৌতম বাবু জেলা পরিষদের তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে সেদিনও দলনেত্রীর মুখ রক্ষা করেছিলেন। পরবর্তীকালে নিজের চেষ্টায় বামপন্থীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শূন্য থেকে ব্যবসা শুরু করেন শিল্পাঞ্চলে। নিজের সততা ও নিষ্ঠায় পরিবহন ব্যবসায় নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। তার সংস্থার লভ্যাংশের একটা অংশ তিনি যেমন দলীয় সংগঠনে দান করতেন, তেমনি বাকি অংশটা সমাজ সেবায় ব্যয় করতেন। তৃণমূলের ২ গোষ্ঠী সব সময় সক্রিয় থেকে এলাকায় যেভাবে সংগঠনে ভাঙন ধরাচ্ছিল তাতে তার কোনো দলীয় পদ না থাকলেও তিনিই সব গোষ্ঠীকে নিয়ে সামাল দিয়ে গেছেন এতদিন। জেলা নেতারাও গোষ্ঠী কোন্দল মেটাতে তার উপরই সর্বশেষ ভরসা করেন। অনুগামীরা জানান, তাকে কোনোদিন জেলা তৃণমূল ভবনে যেতে হয়নি! উল্টে জেলা সভাপতি মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরা, দলের চেয়ারম্যান শুভাশিস বটব্যাল, বিধায়ক অরূপ খাঁ সহ তৃণমূল দলটাই তার কাছে আসতেন। কি মুখ্যমন্ত্রীর, কি অভিষেকের জনসভায় লোক আনার জন্য গৌতম বাবু এবং মঞ্চ তৈরিতেও গৌতম বাবু ছাড়া ভাবতে পারতেন না দলের নেতারা। করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের সময় গোটা জেলায় ত্রাণ নিয়ে ছুটে গেছেন তিনি। প্রায় ১ কোটি টাকার করোনা ত্রাণ বিলি করেছেন বাঁকুড়া জেলায়। এই দুঃসময়ে জেলার ৮০ জন ক্যান্সার রোগীকে ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার দিয়ে গেছেন। দুস্থ গর্ভবতী মহিলাদের জন্য সমপরিমাণ সাহায্য দিয়েছেন। লকডাউনে জেলার যুব সমাজ গৃহবন্দী থেকে মোবাইল ফোবিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন দেখে গৌতম বাবু যুবসমাজকে মোবাইলের হাত থেকে দূরে রাখতে গৌরব ট্রফি ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু করেন। শিল্পাঞ্চলের প্রায় ১৪ শো ক্লাবের ২১ হাজার যুবককে নিয়ে এই গৌরব ট্রফি ফুটবল প্রতিযোগিতা রাজ্যেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রতিযোগিতার সমস্ত ব্যয়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে দল-মত-নির্বিশেষে ৫ শতাধিক লোক নিয়ে পরিচালন কমিটি তৈরি করেছেন। সব দলের প্রতিনিধি রয়েছেন এই পরিচালন কমিটিতে। এলাকার কিশোরী ও যুবতীদের নিয়ে ৫ টি মহিলা ফুটবল দলও তৈরি করেছেন তিনি। নিজের এলাকা দুর্লভপুরে রয়েছে তার নিজস্ব ফুটবল কোচিং ক্যাম্প। এই ক্যাম্প থেকে ৫ জন যুবক ও ১ জন মহিলা ফুটবলার কলকাতার বড় দলে সুযোগ পেয়ে লিগ খেলছেন। এরকম একজন সর্বজনগ্রাহ্য দলীয় সম্পদকে তৃণমূলের হাতছাড়া হওয়ায় আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর বাঁকুড়ার ৫ থেকে ৬ টি আসনে ধ্বস নামতে চলেছে সেটাই এখন রাজনৈতিক মহলের চর্চার মূল বিষয়। জানা গেছে, যিনি দুর্দিনে দলের হয়ে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন দলের সুদিনে সেই গৌতম মিশ্রকে ব্যবহার করলেও তাকে কোনো যোগ্য পদ দেননি এতদিন। ২০১১ সাল থেকে তাকে বড়জোড়া বিধানসভার প্রার্থী করা হবে বলেও দল তাকে ব্রাত্য করেছে। ২০১৪ এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে বাঁকুড়ার আসনে প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল তারই। ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে দল থেকে বড়জোড়ায় প্রার্থীপদ ঘোষণা করেও চিত্রতারকা সোহমকে এনে বসিয়েছিলেন দলনেত্রী। শেষ আশা ছিল ২০১৯ লোকসভায় বাঁকুড়া আসন। সেখানেও তিনি দলের কাছে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। পুঞ্জিভূত অভিমান চেপে রাখলেও দল ছাড়ার কথা ভাবেন নি। গত ৬ মাস আগে তার অভিমান ও ক্ষোভের আঁচ অভিমান  আন্দাজ করে জেলা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিক কাজে তাকে আসতে দিচ্ছিলেন না জেলা নেতৃত্ব। সেই অভিমানেই কি তিনি বিজেপির অন্দরে প্রবেশ করলেন। তার সঙ্গে আরো ৪/ ৫ জন হেভিওয়েট জেলা নেতাও যে জানুয়ারিতেই বিজেপিতে যাচ্ছেন তাঁর বলার অপেক্ষা রাখে না।  বিজেপি থেকেও সবুজ সংকেত পেয়ে গেছেন তিনি। তাহলে সেটা কি বড়জোড়া বিধানসভার সম্ভাব্য প্রার্থী তিনিই সে নিয়েও চর্চা শুরু হয়ে গেল বাঁকুড়ার রাজনীতিতে। এ প্রসঙ্গে বাঁকুড়া জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি শ্যামল সাঁতরা তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, কারও আকাশচুম্বী কোনো ডিমান্ড থাকলে সেটা তো মেটানো সম্ভব নয়! কারণ আমরা দল করি কিছু দেওয়ার জন্য, নেওয়ার জন্য নয়। তবে যে কেউ যেকোনো দলে যেতে পারেন। সেটা তার গণতান্ত্রিক অধিকার। গৌতম বাবু দল ছাড়ায় আমাদের বাঁকুড়া জেলা তৃণমূল কংগ্রেসে কোনো প্রভাব পড়বে না।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 − one =

Back to top button