রাজ্য

আর্থিক স্বচ্ছলতার অভাবে জৌলুস হারাচ্ছে মালিয়াড়া রাজবাড়ীর দুর্গাপূজা ও সাবেকি আনা মেলা মন্ডপ।

নিউজ বেঙ্গল ৩৬৫ ডেস্ক, বাঁকুড়া :- সময়ের স্রোতে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে পুরাতন ঐতিহ্য। পরিবর্তন অবসম্ভাবী। তবে আধুনিকতার ছোঁয়া এতো দ্রুত সর্বত্র গ্রাস করবে এটাই কল্পনা করা যায়না। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত মালিয়াড়া রাজবাড়ীর দু্র্গাপূজা ও সাবেকি দূর্গাপূজা স্বগৌরবে নিজ ঐতিহ্য বহন করে গেছে। রাজনীতি পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও আয়ের উৎস কমে যাওয়ায় সাবেকি আনা ও জমিদারি প্রথা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ভোটের রাজনীতির স্বার্থ জড়িয়ে না থাকলে কোন মেলা-পার্বন সরকারী সহযোগিতা আহানুভূতি পাওয়া যায় না। বাংলায় হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের অনেক ইতিহাস বিজড়িত ঐতিহ্যপূর্ণ মেলা-পার্বন রয়েছে কিন্তু সামান্য আর্থিক সহযোগিতার অভাবে ধুঁকছে। অনুরুপ ভাবে আর্থিক স্বচ্ছলতায় জৌলুস হারাছে মালিয়াড়া রাজবাড়ীর দুর্গাপূজা সাবেকিআনার মেলা মন্ডপ গুলি। মালিয়াড়ার রাজবাড়ীর দুর্গাপূজা ও সাবেকি দুর্গামন্ডপ গুলির পরিস্থিতি আজ আর্ধিক স্বচ্ছলতার অভাবে আড়ম্বরহীন। সাবেকি আনায় যে সকল মেলা-মন্ডপ গুলি রয়েছে তাদের মধ্যে আয়ের উৎস রয়েছে একমাত্র সেই পরিবারগুলির নিজস্বতা বজাই রয়েছে। তবে মালিয়াড়ার রাজবাড়ী ও সাবেকি দুর্গাপূজার পরমপরা পরস্পরের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। হয়তো কোন সাবেকি মেলা অর্থাভাবে পূজা ছেড়ে দিতে পারে, কিন্তু রাজবাড়ীর দুর্গাপূজা কোন রকম ভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। পূজার অনুষ্ঠান সূচী কাটছিট করতে পারে কিন্তু ছেড়ে দেওয়া রাজপরিবারের অসম্মানের পরিণত হতে পারে। সে কারণে অনুষ্ঠানপর্ব ছোট হলেও মালিয়াড়ার রাজ পরিবারগণ বংশপরাম্পর দুর্গাপূজার নিয়মবিধি ধরে রেখেছে। কিন্তু জমিহীন জমিদারগণ কিভাবে জমিদারী প্রথায় দুর্গাপূজার মহোৎসবকে চালিয়ে যাবে ? পিতৃপক্ষ শেষ, দেবীপক্ষের শুরু হতে মালিয়াড়া রাজবাড়ীর দুর্গোৎসব শুরু। দেবীর বোধন হতে বিজয়া দশমী পর্যন্ত তোপের শব্দে আশেপাশের সাবেকি ও বারোয়ারী মেলা প্যান্ডেল গুলির পূজার নির্ঘন্টক সূচনা করে। রাজার এখন কি আছে ? কি নেই । এই নিয়ে চিন্তা ভাবনা কেউ করে না। দশদিন ধরে পূজো চালানো, তোপের খরচ কোথা হতে আসবে? কিভাবে পাবে কেউ জানে না। শুধু সবাই জানে, মহামায়ার পূর্ণক্ষণে রাজবাড়ীর তোপ ফাটলে অন্যান্য সকল মেলা, মন্ডপ গুলিতে বলিদান প্রথা সমাপ্ত হবে। তাই এলাকাবাসীর মুখচেয়ে অতি দুঃরাবস্থায় রাজবাড়ীকে আজো মুখবুজে বিশাল খরচা বহন করে যেতে হয়। এরই মধ্যে রাজবাড়ীকে নতুন সাজে সাজতে হচ্ছে। জীর্ণ কলেবরে প্রলেপ লাগিয়ে দেবীর আগমনে মেতেছে। বাঁকুড়া জেলার বিখ্যাত বিষ্ণুপুর রাজবাড়ীর আদলে মালিয়াড়া রাজবাড়ীর দুর্গোৎসব। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে আমান সিংহাধূর্য্য মালিয়াড়া রাজবাড়ীর দুর্গোৎসব প্রচলন করেন। এর আগের জমিদারগণ বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। তাই সে সময় মালিয়াড়ার দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল না। সেকালে সাবেকি মেলা গুলির জন্ হয় নি। মাতৃভক্তিতে আশক্ত আমান সিংহাধূর্য্য আদ্যাশক্তি দেবী দুর্গার পূজা শুরু করলে সাবেকী মেলা গুলি গড়ে উঠে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে প্রথম মালিয়াড়া বারোয়ারী সার্বজনীন দুর্গাপুজা শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন জাতি নিজ সুবিধার্থে নিজ নিজ মেলা-মন্দর তৈরী করেন। প্রতিটি মেলা-মন্দির বৈশিষ্ঠ ও ঐতিহ্যপূর্ণ। বড়োবুড়ির মেলা। যাকে সবাই বড়োমেলা বলে জানে। এই মেলার মাতৃমূর্তি পুঁথির ডাকে সুসজ্জিত। একসময় এই মেলায় মহাঅষ্টমীর পূর্ণক্ষণ বয়ে নিয়ে আসতো এক উড়ন্ত শঙ্খচিল। তারই শব্দে মেলায় বলিদানে প্রথা ছিল। কিন্তু পরিবেশ দূষণের ফলে বৃক্ষ ও পক্ষী বিলোপের ফলে সে আশায় জল পড়েছে। মালিয়াড়ায় মাত্র দু’টি সিংহবাহিনী মূর্তির দর্শন পাওয়া যায়। প্রথমটি মালিয়াড়া রাজবাড়ীর সিংহবাহিনী, দ্বিতীয়টি পঞ্চানন তলায় বিশ্বাস পরিবারের সিংহবাহিনী। তবে বিশ্বাস পরিবারের সিংহবাহিনীতের কার্তিক, গনেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী থাকেনা। জয়া, বিজয়াকে সাথে নিয়ে মা সিংহের উপর অবস্থিত হয়ে অসুর বধ করছেন। একসময় এই মেলায় মানৎ করে গৃহবধূরা পুত্র সন্তান লাভ করেছেন। একটু পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বাস মেলা। এই মেলার মাতৃমূর্তি আকারে সবচেয়ে বড়ো। একসময় মহাঅষ্টমীর পূর্ণক্ষণে দেবীমুর্তি হঠাৎ ভীষণ কম্পমান হয়ে উঠতো। সাক্ষাৎ মায়ের অর্বিভাবে মাতৃমুর্তি জাগ্রত হয়ে উঠতো। এমন প্রতিটি মেলার নিজম্বতা রয়েছে। যার গুনাগন ও বৈশিষ্ঠে ভরা। মালিয়াড়ায় মোট ২২টির মেলা-মন্দির রয়েছে। এরমধ্যে একটি মাত্র বারি পূজো করা হয়, তাও মাতৃ আদেশে। ইচ্ছা থাকলেও মূর্তি স্থাপনে বাধা রয়েছে। তাই অগ্নিমূল্যের বাজার দর যাই থাক না কেন, মালিয়াড়ার কচি-কাচাদের কাছে দুর্গাপূজা জমজমাট। কিন্তু পরিবারের কর্তার মাথায় হাত। কিভাবে চালাবে দুর্গাপূজার বিশাল খরচ ! পরিবার যা ভাবে ভাবুক, আয় যেখান থেকে হোক মা জুটিয়ে দেবেন। কিন্তু ভ্রমন পিপাষুদের জানাই মালিয়াড়ার আকর্ষণীয় দুর্গাপূজার মহা আনন্দ। মায়ের আগমন হতে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিটি মহুর্ত আনন্দ উপভোগ করার মতো। একবার দেখলে বারবার দেখতে মন চাইবে। মালিয়াড়ার তরফ থেকে সকলকে জানাই দুর্গা উৎসবে সাদর আমন্ত্রণ।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 8 =

Back to top button