অন্যান্য

কালের গ্রাসে বিলুপ্তপ্রায় পাটুলীর “নীহারা” শিল্প

সৌরেন দাস, নিউজ বেঙ্গল 365, আসানসোল:  শুধু গ্রাম নয়,বলা ভালো সম্প্রীতির গ্রাম। কম বেশি সব ধর্মের মানুষের বাস এই গ্রামে। গ্রামের নাম? পূর্ব বর্ধমান জেলার পাটুলী।জীবিকা বলতে মূলত কৃষিকাজ একমাত্র ভরসা। আবার এই গ্রামের বেশ কিছু পরিবার আছে যারা কোনোদিনও চাষবাসের সাথে যুক্ত নয়, আজ বলব তাদের কথা। ব্যতিক্রমী এই পরিবার গুলি যে কাজ করে নিজেদের জীবিকা চালায় তা খুবি আশ্চর্যজনক। ধুলো থেকে সোনা বের করা। অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। চলতি ভাষায় এই কজকে “নীহারা বা নেয়ারা”বলা হয়ে থাকে।এই পরিবার গুলির সোনার সাথে পরিচয় আজন্ম।পাটুলীর তহাবাজার মুসলিম পাড়ার প্রায় দুশো জন ও তাদের পরিবার যুক্ত এই কাজের সাথে। এই কাজের সাথে যুক্ত মহম্মদ মানিক সেখ জানায়, আমার দাদুর দাদুও এই কাজ করতেন,প্রায় তখন থেকেই বংশ পরম্পরায় এই কাজ চলছে। সারা পশ্চিম বাংলার বড়ো বড়ো শহর- মহানগরের বিভিন্ন সোনার ছোট বড়ো দোকান থেকে , দোকানের ধুলো, চাটাই, মাদুর,বালিশ, কার্পেট, তাকিয়া, ছেঁড়া ন্যাকড়া -কাপড় কিনে নিয়ে আসি। দোকানে মাস চুক্তি থাকে কুড়ি হাজার টাকা থেকে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকার । বাড়িতে এই মূল্যবান বর্জ্য পদার্থে আগুন ধরিয়ে ছাই করা হয়। এরপর এই ছাইকে বাড়ির মেয়েরা ঢেঁকিতে কুটে চালনিতে চেলে পুনরায় কুটে গম ভাঙ্গা কলে ছাই ভাঙ্গার নির্দিষ্ট মেশিনে পেশাই করতে হয়। কল থেকে পেশাই করে আনার পর এই ছাইকে শিল্পীরা মশলা বা পাউডার বলেন।দ্বিতীয় প্রক্রিয়া শুরু হয় মশলা থেকে অধাতব অংশ বাদ দেওয়ার মাধ্যমে। শুকনো পাউডার আগে বড়ো আকারের চৌবাচ্চায় ধোয়া হয়। জলে বারংবার ধুয়ে ধাতব পদার্থ গামলায় আটকে রাখা হয়। এই মিশ্রিত ধাতুর সঙ্গে চুন মিশিয়ে ইলেক্ট্রিক হাপড়ে পোড়ানো হয়। অনেকক্ষণ পোড়ানোর পর শক্ত চাঙর বা পাথরের মত পরিণত হয়।চুর্ন ধাতব পদার্থ থেকে সীসা টেনে নেয়। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পাথরটাকে ভাঙ্গলে চুর্নের অংশ আলাদা হয়ে যায়,ও কিছু আরো শক্ত ধাতব পদার্থ অবশিষ্ট থাকে। এই অবশিষ্ট পদার্থে সোহাগা ও কয়েক প্রকার অ্যাসিড মিশিয়ে পুনরায় হাপরে গলালে লোহা ও তামা আলাদা হয়ে যায়। এবং চুল্লি থেকে লাভার আকারে বেড়িয়ে আসে। চুল্লিতে পরে থাকে কঠিন একটা ধাতু খন্ড। এই ধাতুটির নাম পিঞ্জর। পিঞ্জর টুকরো টুকরো করে একটা বিশেষ মাটির কাপে রেখে বিশেষ অ্যাসিড ঢেলে আবার হাতে চালানো হাপরে গলিয়ে তরল করা হয়। প্রসঙ্গত পাঁচ কেজি প্রাথমিক মিশ্রণ থেকে মাত্র 50-80 গ্রাম পিঞ্জর পাওয়া যায়। মাটির কাপটির বিশেষত্ব হচ্ছে প্রচন্ড তাপ এবং কোনো অ্যাসিড একে নষ্ট করতে পারে না। এরপর গলিত পিঞ্জর আবার অ্যাসিড মিশিয়ে পুনরায় হাপরে চাপাতে হয় ও জল দিয়ে ধুয়ে দেখতে হয়। ধোয়া জলটা নীল রঙের হয় এবং জলটা একটা বালতির মধ্যে রাখতে হয়।এই প্রক্রিয়া চার থেকে ছয় বার করতে হয়। ছোট বাটিতে পরে থাকে সাধারণ চা পাতার মতো দানা। এই দানা গুলোই সোনা। আর বালতির নীল জলটা রূপো। আসলে ঐ জলে স্রেফ পরিমাণ মতো তামা ফেলে দিলে 12 ঘন্টা পর জলের তলায় পরে থাকে রূপো, মানিক বাবু আরও বলেন, নীহারার কাজটাই জল, আগুন আর প্রচন্ড পরিশ্রমের। বর্তমানে এই কাজে শ্রমিকদের মজুরী অনেক।এই পারিশ্রমিক দিতে আমরা হিমশিম হয়ে যাচ্ছি। আর লক ডাউনে এর কারনে অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। এমনিতে পিঞ্জর থেকে সোনা নিষ্কাশনের কাজটা নিজেরাই করি। মহামারী পরিস্থিতিতে দেশের বর্তমান অচলাবস্থায় যখন মানুষ একটু খাওয়া ও সুস্থতার আশা করছে , তখন সোনা মানুষের কাছে কতটা প্রাসঙ্গিক তা আর কাউকে বোঝাতে হয় না। কিন্তু এর অপরদিকে এই শিল্পের সাথে জড়িত। এই মানুষ জন এখন কি করবেন। প্রশ্ন এখন এটাই।SHOW LESS

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button