কলকাতা

“এই সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের কষ্ট হয়েছে।” প্রণব মুখোপাধ্যায়কে সমর্থন করে মন্তব্য করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

নিউজ বেঙ্গল ৩৬৫ ডেস্ক : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের পিছনে তার অবদান যথেষ্ট। ১৯৮৪ সাল। লোকসভা নির্বাচন। যাদবপুর কেন্দ্রে হেভিওয়েট বাম প্রার্থী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। বিপরীতে দাড়ানোর মত যুতসই প্রার্থী পাচ্ছেনা কংগ্রেস। সেই সময়ের কংগ্রেস নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিযে গেলেন প্রদেশ নেতৃত্বের কাছে। নাম পাঠানো হল। সেই নাম এআইসিসির আপত্তি সত্ত্বেও অনুমোদন করিয়ে নিয়ে এলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। আর তারপর! বাকিটা তো ইতিহাস। সোমনাথ চট্টোপাধ্যয়কে হারিয়ে পার্লামেন্টে গেলেন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। এরপর যতদিন গিয়েছে সম্পর্ক গভীর হয়েছে প্রণব- মমতার। অথচ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সেই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নামেই প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১২। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ইউপিএ থেকে প্রার্থী হিসাবে মনোনীত করা হল অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নাম। সেই সময় ইউপিএ’র অন্যতম বড় শরিক তৃণমূল। বলা যেতে পারে দ্বিতীয় শরিক। একজন পূর্ণমন্ত্রী ( তাও আবার রেল) সহ ৪ জন রাষ্ট্রমন্ত্রী। তাই গুরুত্ব হয়ে উঠল তৃণমূলের ভুমিকা। কিন্তু বেঁকে বসলেন মমতা। অন্য যে কেউ হোক, কিন্তু প্রণব মুখোপাধ্যায়কে মেনে নেবেন না। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন সোনিয়া গান্ধীকে। এমনকি বিভিন্ন দলের সঙ্গে বিকল্প নাম নিয়ে বৈঠকও শুরু করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। অন্যদিকে ইউপিএ চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধীকে জানিয়ে দিলেন এপিজে আব্দুল কালামকে প্রার্থী করা হোক। এমনকি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রার্থিপদ আটকাতে ১২ জুন ২০১২ সমাজবাদী পার্টি সুপ্রিমো মুলায়ম  সিং যাদবের সঙ্গে মিটিং করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মিটিং এর পর যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়ে দেওয়া হল কোনভাবে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে সমর্থন নয়। পাল্টা সোমনাথ চট্টোপধ্যায়, কৃষ্ণা বসু ও ড: মনমোহন সিংয়ের নাম প্রস্তাব করলেন মমতা। যদিও পরবর্তী সময় কার্যত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একা ফেলে প্রণব মুখোপাধ্যায়কেই সমর্থনের কথা ঘোষনা করে সমাজবাদী পার্টি। বাংলার জন্য কোন বরাদ্দ করেননি অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়, এই অভিযোগ জানালেন সোনিয়া গান্ধীর কাছে। এমনকি প্রণব বিরোধীতায় একটি বাংলা দৈনিক ও একটি বৈদ্যুতিন মাধ্যমও নানা ধরনের আক্রমণ শুরু করল। করে। তবে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার আগে রাজ্যকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে যান। যদিও তৃণমূলের একটা বড় অংশই মনেপ্রাণে প্রণব মুখোপাধ্যায়কেই সমর্থন করতে চাইছিলেন। এমনকী প্রণব মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা হওয়ার পর তৃণমূলের মুখপত্র জাগো বাংলায় হেডলাইন করা হয় “আমরা লজ্জিত, আমরা স্তম্ভিত”। অবশ্য মমতার এহেন আচরণের পরও বোন বলে ডেকেছেন। এমনকি তার জয়ের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ বলেও একাধিকবার জানিয়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। যদিও পরে সেই সম্পর্ক অনেকটাই ভাল হয। দিল্লী গেলে “বোন” মমতার জন্য ” দাদা” প্রণব মুখোপাধ্যায়ের দরজা সব সময় খোলা থাকত। যে কোন সমস্যয় প্রণব মুখোপাধ্যায় ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র অন্যতম ভরসা। আর যতদিন পেরেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়ে গিয়েছেন। দিল্লীর রাজনীতির অন্দরে কান পাতলেই শোনা যায় ২০১১ সালে রাজ্যে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট করতে সোনিয়া-রাহুলকে রাজি করানো  থেকে শুরু করে রাজ্যে আটোসাটো কেন্দ্রীয় নিরাপত্তায় ভোট করানো, সব কিছুই ছিল  ” চাণক্য”র পরিকলপনা। তবে তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভুমিকায কষ্ট পেয়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। একবার মমতাকে সেই বিষয়টি জানিয়েও ছিলেন। তার উত্তরে মমতার বক্তব্য ছিল,” যা হয়েছিল সে গুলো আর মনে রাখবেন না।” দক্ষ রাজনীতিক “প্রণব দা” বোন মমতার সেই কথাই মেনে নিয়েছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে দিল্লী গেলে একবার ” প্রণব দা”র সঙ্গে দেখা করতেন। সঙ্গে নিয়ে যেতেন মুঠোমুঠো এক্লিয়ার্স। আর প্রতি পুজোয় শুভ্রা মুখোপাধ্যায়  শাড়ি পাঠাতেন ননদ মমতাকে। একবার বিদেশ থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জন্য স্যুটের কাপড় নিযে আসেন মুখ্যমন্ত্রী। দিল্লী থেকে টেলর গিয়ে মাপ নিয়ে আসে। একবার বিদেশ সফরে ওই স্যুট পড়ে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। তবে এই সৌজন্যের মধ্যেও ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি পদে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নামে বিরোধীতা মনে রাখবে ইতিহাস। এই প্রসঙ্গে কংগ্রেস মূখ্য সচেতক মনোজ চক্রবর্তীর বক্তব্য,” উনার এটাই স্বভাব। মুখে বাঙালী প্রেমের কথা বললেও সেই সময় এক বাঙালীরই রাষ্ট্রপতি হওয়া আটকাতে উঠে পড়ে লেগেছিলেন। প্রণব মুখোপাধ্যায় মারা যাওয়ার পথে উনি দেখছি কেদে ভাসিয়ে দিচ্ছেন।” অন্যদিকে বিজেপি রাজ্য  সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, ” যারা প্রণববাবুকে সব থেকে বেশী অপমান করেছেন, ভোট দেন নি, এখন দেখছি তারাই মরা কান্না কাদছেন।” তবে হ্যা। প্রথমদিকে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নাম নিযে বিরোধীতা শেষ পর্যন্ত কার্যত চাপে পড়েই তাকেই ভোট দেয় তৃণমূল।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button