কলকাতা

দেশের প্রথম বাঙালী রাষ্ট্রপতির ইনস্যুরেন্স এজেন্টের কলমে শ্রদ্ধার্ঘ্য।

একটু বোধ হয় বেশীই দু: সাহসী  হয়ে গিয়েছিলাম। এক পরিচিতের কাছ থেকে নম্বর পেয়ে ফোনই করে বসলাম। ও পাশে তখন দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি। “চাণক্য”প্রণব মুখোপাধ্যায়। ফোন তো করে বসলাম, কিন্তু আসল কথা টা বলব কীভাবে? অতবড় মাপের একজন মানুষ! মনে মনে রামকৃষ্ণ স্মরণ করে বলেই ফেললাম। “স্যার আমি এল আই সি থেকে দেবাশিস বলছি একটু সময় চাই।” ওই দিক থেকে শুধু উত্তর এল, ” এল আই সি? হঠাৎ। ঠিক আছে আমি সামনের সপ্তাহে কলকাতা যাব। একবার ফোন করে নিও সময় সুযোগ হলে,,,,,।” আমি তো হাফ ছেড়ে বাচলাম। সত্যি বলছি এত নার্ভাস কোনদিন ও হইনি। অপেক্ষা করতে থাকলাম। অবশেষে সেই “সামনের সপ্তাহ” এল। আবার ফোন করলাম। উনি আসতে বললেন।  এখনও মনে আছে সেটা ছিল ১৮ এপ্রিল ২০১৮। সন্ধ্যে ৭ টা, সময ঠিক হল। আমি তৈরি হয়ে পৌছে গেলাম “স্যার” এর ঢাকুরিয়ার বাড়ি। একটু আগেই পৌছে ছিলাম। গেটে বলা ছিল, তাই খুব একটা বাধা পেতে হয়নি। যাই হোক সঙ্গে এক বন্ধুকে নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছি, এমন সময় গলার আওয়াজ পেলাম, ” দেবাশিস আসুন।” ঘরে গেলাম। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী পড়ে বসে রয়েছেন ভারতের রাজ নীতির “চাণক্য”। আমার কাছে সরস্বতীর বরপুত্র। বসার পর চা এল। বিস্কুট এল। মিষ্টিও এল। আমাদের তো কিছুতেই মন নেই। দরদর করে ঘামছি। উনি কথা শুরু করলেন। বললেন,” ৩ মিনিট সময় আছে। আপনি তৈরি হয়ে এসেছেন তো?” আমি যেন ঠিক এই অপেক্ষায় ছিলাম। প্রথমেই প্রণাম করে আশীর্বাদ চেয়ে নিলাম। দেখলাম উনি হাসতে হাসতে বললেন,” 2 মিনিট তো চলে গেল। নাও বল কি বলবে।” আপনিটা তুমিতে নেমে আসায় বুকে বল পেলাম। মনে আছে একটা পেনশন স্কিমের জন্য উনাকে বুঝিয়েছিলাম। বলেছিলাম,” স্যার আপনার মত মানুষ যদি রাষ্ট্রপতি পেনশন পাওয়ার পরও আলাদা একটা পেনশন স্কিম করেন তাহলে অন্তত দেশের বাকি লোকজন কাছে এই পেনশন স্কিমের প্রযোজনীয়তা বুঝতে পারবে।” উনি ব্রোশিয়র চেয়ে নিয়ে  ভাল করে পড়লেন। আমিও উনার বয়স অনুযায়ী প্রিমিয়াম কত হতে পারে বললাম। টেবিলে তখন ও চা পরে। একবার সেদিকে তাকিয়ে বললেন,” আরে ওটা আগে শেষ করো। তোমরা তো খেতেই পার না।” তবে সব খুটিয়ে পড়ে জানতে চাইলেন ,” আচ্ছা নমিনি কাকে কাকে করতে পারব?” উত্তর পাওয়ার পর শুধু জানালেন , ” বুঝলাম সব কিছু। কিন্তু আমি এখনই তোমায় কিছু বলছি না। দিল্লী গিয়ে জানাবো। তুমি একটু বাবু ( ছেলে অভিজিত মুখোপাধ্যায়) র সঙ্গে যোগাযোগ রেখ।” সেদিনের মত বাড়ি ফিরে এলাম। এরপর অপেক্ষা। কোন অচেনা বা দিল্লির নম্বর থেকে ফোন এলেই ভাবতাম হয়ত ওখান থেকে ফোন। তবে আমার ও জেদ চেপে গিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে একবার করে ফোন করতাম। পাক্কা প্রায় ৩ মাস। জুন মাসের শেষেরদিকে সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন এল। এবার ফোনের  ওই প্রান্তে স্বয়ং প্রণব মুখোপাধ্যায়। নিজেই ফোনে বললেন,” দেবাশীষ বাবুকে দিয়ে কাগজ পাঠিয়ে দিও। ওর কাছ থেকে আমার সব কাগজ নিয়ে নিও।” ৯ জুলাই ২০১৮। বলা যেতে পারে ওই তারিখেই একটা রেকর্ড হল ইনস্যুরেন্স সেক্টরে। এই প্রথম দেশের কোন প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান নিজের নামে কোন পলিসি করলেন। জীবন অক্ষয়-৬  পেনশন স্কিমে সই করলেন তিনি। নমিনি ছেলে অভিজিত মুখোপাধ্যায় ও মেয়ে শর্মিষ্ঠা। আর আমি হলাম দেশের প্রথম বাঙালী রাষ্ট্রপতির ইনস্যুরেন্স এজেন্ট। এরপর প্রায় প্রতি সপ্তাহে ফোনে খোজ খবর নিতাম। ঐ “স্যার”টাও কখন যেন “দাদা”তে নেমে এসেছিল। যখনই কোনও সমস্যয় পড়েছি হয় ছুটে গিয়েছি ১০, রজাজি মার্গের বাড়ি বা ফোন করেছি। একজন বাবার মত পরামর্শ দিয়েছেন। আগলে রেখেছেন। এমনকি যেদিন উনি বাথরুমে পড়ে মাথায় চোট পান তার আগের দিন রাতেও কথা বলেছি। আর ওই  নম্বরে ফোন করলে উনি ফোন ধরে জানতে চাইবেন,” কেমন আছ?” তবে সোদপুরের এই এক সামান্য এলআইসি এজেন্টকে উনি যেই বিরল সম্মান দিয়েছিলেন, না এই ঋণ কোনদিন শোধ হবেনা। আজই আমরা ওনার “ক্লেম সেটেলমেন্ট” এর কাজ শুরু করব। ভাল থাকুন প্রণব দাদা।     

দেবাশীষ দত্ত( প্রণব মুখোপাধ্যায় এর বীমা এজেন্ট)

ReplyForward
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button