কলকাতা

আজও মনের মনিকোঠায় তালকোটরা রোডের বাড়িতে কাটানো সেই ১২ মিনিট

সুমন গাঙ্গুলী। সম্পাদক। নিউজ বেঙ্গল ৩৬৫

২০১১ সালের নভেম্বর মাস। একটা দৈনিক পত্রিকার কাজে দিল্লী গেছি। সঙ্গে বিশিষ্ট সাংবদিক জয়দীপ সান্যাল। তখন পার্লামেন্ট চলছে। আর হাতে সময় ও আছে, তাই ঠিক করলাম অধিবেশনটা দেখি। কিন্তু উপায়? সেই সমযের প্রদেশ  কংগ্রেস সভাপতি মানস ভুইযাকে অনুরোধ করলাম। উনি সংসদে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিলেন। না। এই অধিবেশন দেখার বিষয় টা আসল নয়। সেদিনের সেই অধিবেশন দেখতে গিয়ে  গর্ব হয়েছিল এক বাঙালীকে দেখে। আমরা মানে আমি আর জয়দীপদা গিয়ে বসলাম সংসদের ভিজিটর্স সিটে। উপর থেকেই দেখতে পেলাম কালো কোট পড়া এক বাঙালী সন্তানকে। তিনি আর কেউ নন প্রণব মুখোপাধ্যায়। সংসদে তখন মহারথীদের ভীড়। কিন্তু তার মধ্যেও তিনি যেন সবার থেকে আলাদা। কিছুক্ষণ পর সংসদে ঢুকলেন কংগ্রেস সভাপতি ও রায়বেরিলির সাংসদ সোনিয়া গান্ধী। সংসদে উপস্থিত থাকা সব কংগ্রেস সাংসদ উঠে দাড়ালেন যতক্ষণ না সোনিয়া গান্ধী সামনের সারিতে তার জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারে বসেন। উঠলেন না শুধু একজন। এমনকি দলনেত্রীর দিকে ফিরেও তাকালেন না। আর তারপর অবাক করে দিয়ে দেখলাম নিজের আসনে বসার আগে সোনিয়া গান্ধী গেলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আসনের সামনে, হাত জোড় করে নমস্কার করলেন “প্রণব দা” কে। মুচকি হেসে পাল্টা নমস্কার করে নিজের আসনে সেই পরিচিত ভঙ্গিমায় বসে পড়লেন অর্থমন্ত্রী  প্রণব মুখোপাধ্যায়।   হাতে তখনও ৪ দিন সময়। ওই দৈনিক পত্রিকার জন্য শুভেচ্ছা চাই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের। কিন্তু কীভাবে দেখা করব কিছুতেই মাথায় আসছিল না। ভয়ে ভয়ে ফোন লাগিয়ে দিলাম। ফোন ধরলেন বহুদিনের সঙ্গী প্রদ্যুৎ গুহ। না খুব একটা আশা দেখলাম না। তাহলে উপায়? ভরসা সেই মানস ভুইয়া। দুদিন সময় চেয়ে নিলেন। আমরাও ফেরার ফ্লাইটের টিকিট বাতিল করে থেকে দিলাম বঙ্গ ভবনে। তবে দুদিন নয়। ঠিক পরের দিন সন্ধ্যে ৬ টা নাগাদ ফোন এল মানস দা’র। তিনি যা বললেন শুনে তো মাথা খারাপ হওযার জোগার। সন্ধ্যে ৭ টা নাগাদ পৌছে যেতে হবে ১৩ , তালকাটরা রোডে। অর্থাৎ সময় দিয়েছেন  প্রণব মুখোপাধ্যায়। পরি কি মরি করে ছুটলাম, তালকাটরা রোডের দিকে। আগে থেকেই বলা ছিল দেখা করতে হবে প্রদ্যুৎ গুহ’র সঙ্গে। প্রযোজনীয় সিকিউরিটি চেকিং-এর পর ভিতরে ঢুকলাম। মানস দা  আগে থেকেই বলে রেখে দিয়েছিলেন, তাই প্রদ্যুৎ গুহকে আর বেশী কিছু বলতে হল না। বললেন “একটু অপেক্ষা করো।” তবে স্পষ্ট করে বলে দিলেন ” সময় কিন্তু ২ মিনিট। উনি খুব ব্যাস্ত”। প্রতিরক্ষা বাহিনীর কনভয়ে ১৩,তালকাটরা রোডের বাড়িতে ঢুকলেন কীর্ণাহারের পল্টু থেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী প্রণব মুখোপাধ্যায়। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০ মিনিট পর ডাক এল। নিজের স্টাডি টেবিলে বসে আছেন অর্থমন্ত্রী। পাশে রাখা একগাদা অর্থনীতির মোটা মোটা বই। সেখান থেকেই নোট নিচ্ছেন তিনি। আর সামনে আমরা ২ মূর্তি। ওই শীতেও রীতিমত ঘামছি। আর বারবার ঘড়ি দেখছি। সময় যে মাত্র ২ মিনিট। লিখতে লিখতেই একবার মুখ তুলে চশমার ফাক দিয়ে তাকালেন আমাদের দিকে। হাতের ইশারায় বসতে বললেন, আমরা তখন বাধ্য ছেলে। হাতে সময় কম। প্রায় 2 মিনিট ছুই ছুই। খানিকটা বাধ্য হয়েই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। মুখে আঙুল দিয়ে বললেন, একটু পরে। আমরাও চুপ। ওদিকে  2 মিনিট পার।  পরবর্তী এপোযেনটমেন্ট। স্বাভাবিকভাবেই অর্থমন্ত্রীর বাংলোয় থাকা অফিসার ঘরে এসে মনে করিয়ে দিলেন আমাদের সময় শেষ। উঠতে যাব, ফের আগের মত ইশারায় বসতে বললেন আমাদের। আর তারপর। নানান কথা, রীতিমত আড্ডা। শহরের কি অবস্থা। আমরা পেশায় সাংবাদিক বলে পরপর জানতে চাইলেন রাজ্যের খবর, রাজনীতির খবর থেকে বাদ গেল না ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের কথাও। ২ মিনিট দেখতে দেখতে ছুলো ১২ মিনিট। ঐ দৈনিক পত্রিকার উদ্বোধনের আমন্ত্রণ জানালাম। মন দিয়ে শুনলেন আমাদের কথা। বললেন, ” যদি কলকাতা যাই অবশ্যই তোমাদের অনুষ্ঠানে যাব।” উঠে আসার আগে কলকাতা থেকে নিয়ে  যাওয়া কে,সি দাসের ” সুগার ফ্রি” রসগোল্লার টিন রাখলাম টেবিলের ওপরে। আমরা বেড়িয়ে আসব। দাদা-ভাই দুজন দুজনের দিকে ইতস্তত ভাবে চেয়ে আছি। আচমকা নিজেই বললেন, ” কি ছবি তুলবে? ক্যামেরা আছে? ” আসলে এটাই আমাদের মনের কথা। কিন্তু প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ব্যাক্তিত্বের কাছে সেই ইচ্ছে প্রকাশ করাটাই তো বিরম্বনা। আমরা সঙ্গে করে ক্যামেরা নিয়ে আসিনি শুনে নিজেই বললেন, ” ওই মোবাইলে না কিসে ছবি তোলা যায়, সেটাতেই তোল।” নিজের পাশে রাখা মোবাইল দেখিয়ে বললেন, ” তোরা সব আধুনিক যুগের ছেলে, কত কিছু পারিস। আমি শুধু ফোন ধরা ছাড়া কিছুই পারি না।” পরপর দাড়িয়েছি, ছবি তুলব। হঠাত চোখ পড়ল টেবিলের উপর রাখা রসগোল্লার টিনের ওপর। ছবি তোলা থামিয়ে আমাদের বললেন, ” ওরে এই মিষ্টি গুলো সরিয়ে ফেলে দে। সবাই বলবে লোভী বুড়োটা খালি মিষ্টি খায়। আমার আবার সুগার। তোদের জেঠিমা জানতে পারলে আর এক সমস্যা।” এরপর চলে আসার পালা, আমরা ২ জন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। বা-হাত দিয়ে আমাদের মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ” তোরা সবাই ভাল থাক। আর এমন কিছু কর যাতে বাংলার ভাল হয়।”  না ঐ দৈনিকের উদ্বোধনে আসতে পারেননি তিনি। তারপর আরো বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছিল। দ্বিতীয়বার আবার আমরা যাই সেই ১৩ , তালকাটরা রোডের বাড়িতে। সেদিনই কংগ্রেস তাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসাবে নাম ঘোষনা করে। সেদিন ও আমরা দেখা করেছিলাম। আমাদের আগে দেখা করতে এসেছেন রিলায়েন্স গোষ্ঠীর মুকেশ আম্বানি। আর তারপরে আমাদের সময়। সেদিন ও আমাদের মাথায হাত রেখে বলেছিলেন,” সব ভাল আছিস তো?” রাষ্ট্রপতি হও যার পর গিয়েছি রাইসিনা হিলসে রাষ্ট্রপতি ভবনে।

তখন তিনি রাস্ট্রপতি। তাই প্রটোকল অনেক বেশী। তার মাঝেই আস্তে আস্তে আপনজন হয়ে উঠা প্রদ্যুৎদা’র কাছে আবদার ” দাদা একবার উনার সাথে দেখা করব।” কোন আগাম এপোয়েন্টমেন্ট নেই দেখা করা তাই অসম্ভব। তাও আমাদের নিজের অফিসে বসিয়ে কথা বলতে গেলেন প্রদ্যুৎ গুহ দা। রাষ্ট্রপতি তখন ব্যাস্ত নিত্য পূজায়।  প্রদ্যুৎ দা জানালেন তারপর মাত্র ১ মিনিট সময়। না সেটা আর বেড়ে ১০-১২ মিনিট হয়নি। আর একদম শেষ দেখা জুন মাস, ২০১৯ সালে ১০ রাজাজি মার্গের বাড়িতে। সেইবারো মিষ্টি দিয়ে এসেছিলাম। আবার দিল্লী যাব । কিন্ত আর কোনদিন দেখা হবে না মানুষ টির সঙ্গে।

প্রণাম প্রণব মুখোপাধ্যায়।   


ReplyForward
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button