সম্পাদকীয়

দুই ঐতিহাসিক নায়ক: না দুই ঐতিহাসিক ভুল!

#বিশেষ সম্পাদকীয়#             -ঋতব্রত ভট্টাচার্য-                     

দুই বাঙালী। প্রজন্মের বিচারে প্রায় কাছাকাছি। একজন কীর্ণাহারের দরিদ্র বাহ্মন অথচ মেধাবী বঙ্গসন্তান। অপরজন ধনী প্রতিষ্ঠিত পরিবারের বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার। একজনের চণ্ডীপাঠ ও হিন্দু শাস্ত্রের প্রতি অগাধ বিশ্বাসী, অন্যজন নাস্তিক। একজন রাষ্ট্রপতি অন্যজন ভারতবর্ষে নজির সৃষ্টি করে মুখ্যমন্ত্রী পদে প্রায় তিন দশক থেকে গিয়েছেন। দুই বঙ্গসন্তানের অধরা থেকে গিয়েছে একটি পদ, ভারতের প্রথম বাঙালী প্রধানমন্ত্রী হওয়া। যদিও দুজনের কেউই বাঙালী হিসাবে রাজনীতিতে পরিচয় পাওয়ার জন্য আলাদা করে আত্মশ্লাঘা অনুভব করতেন না। কিন্তু বাঙালীর কাছে তারা চিরকাল থেকে যাবেন বাংলার রাজনীতির অঙ্গনে দুই  শক্তিশালী বাঙালী হিসাবে। এই দুই বাঙালী ক্ষমতার অলিন্দে প্রধানমন্ত্রীর মসনদের খুব সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিলেন। প্রায় সমস্ত মহাকাব্যে সাধারণত যা ঘটে থাকে এক্ষেত্রেও তাই হল। এই দুই মহানায়কের  অত্যন্ত কাছের যারা, তারাই পিছন থেকে ছুরি মারেন। সেই জন্যই এই দুজন ভারতবর্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী মসনদে বসতে পারেননি। একজন প্রণব মুখোপাধ্যায় অপরজন জ্যোতি বসু। একজন রিপোর্টার হিসাবে তখন জঙ্গিপুরে প্রণববাবুর খুব কাছাকাছি আসার সৌভাগ্য হয়েছিল। একদিন সন্ধ্যাবেলায় নেহাতই সারাদিনের প্রচারের ধকলের পর প্রণববাবু স্নান করে এসে বসলেন গল্প-গুজব করতে। কেমন যেন চেনা ছকের বাইরে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিলেন। সুযোগ সন্ধানী সাংবাদিকের মতো পেশাদারী দক্ষতায় প্রশ্ন করেছিলাম প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়ে। মুহূর্তের জন্য যেন সতর্ক হয়ে গেলেন। শুধু হেসে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তার কোন বাসনাই নেই। কারন, তিনি নাকি ভালমতো হিন্দি বলতে পারেন না সেইজন্য। বরং, তিনি অবসর নিয়ে লেখালেখি পড়াশোনায় ডুবে যাবেন। যতই উনি ভারতীয় রাজ নীতিতে চাণক্য হোন না কেন, মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, যেন এক অভিমান ঝড়ে পড়ছে ভারী হাই পাওয়ার চশমায়  আড়াল করা বিচক্ষণ চোখ থেকে।নিজেও জানতেন মসনদে বসার জন্য সেই মুহুর্তে গোটা দেশজুড়ে যারা আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম যোগ্য তিনি। তাই হয়ত নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। একই ঘটনা জ্যোতি বসুর জীবনেও। পার্টির ঘনিষ্ঠ কমরেড’রাই পিছন থেকে ছুরি মারে শেষবেলায়। সেই সময় যারা তথাকথিতভাবে কমিউনিস্ট বিরোধী, সেই সমস্ত বিরোধীরা বারবার বলা সত্ত্বেও পার্টি কমরেডরাই তাকে প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসতে দেয়নি। প্রণববাবুর ক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন সত্যি কি প্রনব মুখোপাধ্যায় দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে সবাই তাকে মানবে। ঠিক একই প্রশ্ন ছিল জ্যোতি বসুর ক্ষেত্রেও। আর সেটা তুলেছিল খোদ পার্টি কমরেডরাই। এমনকি গন আন্দোলনের মাধ্যমে রাস্ট্রতন্ত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে না এলে মসনদে বসে লাভ কী? উঠেছিল এই প্রশ্নটিও। প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী হলে গান্ধীজীর আদর্শে সত্যি কি অন্য ভারত পেতাম? অথবা জ্যোতি বসু পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী হয়ে অচিরেই কি বিপ্লব নিয়ে আসতে পারতেন? না। হয়ত পারতেন না। কিন্তু যা তাঁরা পারতেন তাতে তাদের ব্যাক্তিগত অথবা বাঙালীর লাভ ছেড়ে দিয়েও হলফ করে বলা যেতে পারে তাদের পার্টির অন্তত এই অব্স্থা হত না। কংগ্রেস নরেন্দ্র মোদীর প্রবল প্রতাপে এমনভাবে ডুবে যেত না, আর জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হলে এত তাড়াতাড়ি বাংলা তথা ভারতের মানচিত্রে অপ্রাসঙ্গিক হত না সিপিএম ও বামেরা। একজন নির্বাসিত সম্রাটের মতো রাইসিনা পাহাড়ের ওপর  রাষ্ট্রপতি ভবনে শুধুমাত্র সাংবিধানিক পদ নিয়েই সন্তষ্ট থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। অপরজন মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে একা নির্জনে ইন্দিরা ভবনে শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন। আসলে এই ২ নায়ক বা বাঙালী আইকন ২ টি ঐতিহাসিক ভুলের ফসল। এই বিতর্ক চিরকাল রয়ে যাবে আর সেই জন্যেই এরা নায়ক হয়ে থেকে যাবেন বাংলা আর ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।     

( মতামত নিজস্ব। লেখক বিশিষ্ট রাজনৈতিক সাংবাদিক, চিত্র পরিচালক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সম্পাদক)

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button