সম্পাদকীয়

ঘোড়া কেনাবেচায় বরাবরই সিদ্ধহস্ত সিন্ধিয়ারা। ভুল রাহুলেরই।

*বিশেষ সম্পাদকীয়*
# সুমিত চৌধুরী #

ঘোড়া কেনাবেচার লড়াইতে মধ্যপ্রদেশে বিজেপি জিতেছে এটা পুরনো খবর। একটা নিউজ থ্রেডে দেখলাম রাহুল গান্ধী বলেছে, জ্যোতিরাদিত্য আমার সহপাঠী ছিল। কংগ্রেস তাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছিল। জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার এই ধরনের কাজের কারণ বুঝলাম না।রাহুল গান্ধীর স্কুলে ভারতের ইতিহাস এতটা বিশদে পড়ানো হয় না।
না হলে রাহুল জানতেন ঘোড়া বেচাবেচি বা ঘোড়া বাছাবাছি তে সিন্ধিয়ারা বরাবরই পারদর্শী।
আমি আরো একবার আপনাদের সিপাহী বিদ্রোহের সময়কার গল্প শোনাবো। ভারতবর্ষের ওয়ার হিরোদের মধ্যে ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ তুলনা রোহিত। সত্যি কথা বলতে কি, সমরবিশারদ হিসেবে ঝাসির রানীর সঠিক মূল্যায়ন এখনো হয়নি। ঝাঁসি রক্ষার জন্য লক্ষ্মীবাঈ এর প্রাণপণ লড়াই আমরা জানি। ইংরেজদের গোলায় ভেঙে যাওয়া তোপ মঞ্চ রানী রাতারাতি নিজে তদারকি করে ফের গড়ে তোলেন। ইংরেজি রা ‘যাতে দূরবীন ব্যবহার করেও বুঝতে না পারে, সেই জন্য সিপাহিদের নির্দেশ দেন কম্বলে গা মুড়িয়ে দুর্গ প্রাকারে উঠতে। নানাসাহেব ঝাঁসির রক্ষার জন্য তাতিয়া টোপি কে পাঠিয়েছিলেন। শেষ অব্দি ঝাঁসি রক্ষা করা যায়নি। রানীর বাবা যুদ্ধে মারা যান। গভীর রাতে গেরিলা কায়দায় মাত্র ১৫ জন সহচর নিয়ে নিজের দ্রুতগামী ঘোড়ায় ব্রিটিশ সৈন্যেরব্যারিকেড ভেঙে লক্ষীবাই বেরিয়ে যান। লেফটেন্যান্ট বৌকর ঝাঁসির রানী কে আটকাতে গিয়ে তলোয়ার যুদ্ধে কুপোকাত হলেন রাণীর কাছে। রানী ব্রিটিশদের ব্যারিকেড ভেঙে কাল্পীতে হাজির হলেন। সেখানে তখন তাতিয়া টোপি ছাড়াও নানা সাহেবের ভাই শ্রীমন্ত রাও হাজির। কাল্পীতে ফের একদফা লড়াই ব্রিটিশদের সঙ্গে। শেষে তুমুল লড়াইয়ের পর ব্রিটিশরা রিইনফোর্সমেন্ট এনে কাল্পীর দখল নিল।
লক্ষীবাই হাল ছাড়ার পাত্রী নন। সাহায্যের আশায় চললেন গোয়ালিয়রের দিকে। তাতিয়া টোপি, শ্রীমন্ত রাও আশা করেছিলেন গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া এই বিপদের দিনে পাশে দাঁড়াবেন। তখন গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া জয়জীরাও। জয়জিরাও এর ধুরন্ধর মন্ত্রী দিনকর রাও পরিকল্পনা করলেন গোপনে ব্রিটিশদের সাহায্য চেয়ে পাঠানো হবে। ততদিন বাবা বাছা করে বিদ্রোহীদের ঠেকিয়ে রাখা হবে।
কিন্তু ১৮৫৮ সালের পয়লা জুন ঝাঁসির রানী শ্রীমন্ত রাও রা যখন গোয়ালিয়রের কাছাকাছি চলে এলেন
তখন সিন্ধিয়া জয়জী নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন, আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করবেন। সেইমতো বাহাদুরপুরে এসে সিন্ধিয়া জয়জী কামান লাগতে শুরু করলেন।
আচমকা আক্রমণে বিদ্রোহীরা প্রথম দফায় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়লেও লক্ষ্মীবাঈ ৩০০ জনের এক অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে সিন্ধিয়ার তোপখানার উপর চড়াও হন। লক্ষ্মীবাঈ এর বীরত্বের মুখে সিন্ধিয়া দের গোলন্দাজ বাহিনী তোপ ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। অবস্থা দেখে সিন্ধিয়া জযজী আগ্রায় ব্রিটিশদের আশ্রয়ে পালিয়ে যান।
এরপরে ব্রিটিশদের বাহিনী এসে গোয়ালিয়র দুর্গ অবরোধ করে। ১৫ দিন পর্যন্ত প্রতিরোধ করবার পর যুদ্ধের ফলাফল ক্রমশ ব্রিটিশদের অনুকূলে যেতে থাকে। এর মধ্যে লক্ষ্মীবাঈ এর নিজস্ব ঘোড়া যুদ্ধে আহত হয়।
১৭ ই জুন দুর্গের বাইরে একটি নির্ধারক লড়াই চলছিল। দুর্গ হাতছাড়া হচ্ছে দেখে লক্ষ্মীবাঈ নিজের পালিত পুত্রকে পিঠে বেঁধে আরো একবার লড়াই দিতে দিতে ব্রিটিশ সৈন্যের ঘেরাওভেঙে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল গোয়ালিয়ার ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে নতুন করে নানা সাহেবের সঙ্গে মিলিত হয়ে বিদ্রোহীদের পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করা।
কিন্তু ঝাঁসির রানী জানতেন না গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া দের অশ্বশালা থেকে যে ঘোড়াটি সিন্ধিয়া দেরই এক রাজকর্মচারী রানীকে বেছে দিয়েছে, সেটি দুর্বল। লোকশ্রুতি এইরূপ, সিন্ধিয়া জয়জী রাও এর গোপনে পাঠানো নির্দেশেই লক্ষীবাই কে ওই দুর্বল ঘোড়াটি দেয়া হয়েছিল। লক্ষীবাই যখন ব্রিটিশ সৈন্য সংহার করতে করতে তলোয়ার চালিয়েব্রিটিশদের ব্যারিকেড ভেঙে বেরিয়ে যাচ্ছেন,সামনে পড়ল একটি ছোট ঝরনা। লক্ষ্মীবাঈ এর এই ঘোড়া সেই ঝর্ণা টপকে বেরোতে পারল না।
পেছন থেকে ব্রিটিশ সৈন্যরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
রানী বীরের মতো লড়তে লড়তে প্রাণ দিলেন। তখনো পিঠে বাধা তার শিশুপুত্র।
ইতিহাসের এত সাতকাহন শোনানোর মোদ্দা কথাটা এই, ইতিহাস ঠিকঠাক পড়া থাকলে, রাহুল জানতেন ঘোড়া বেচাই হোক, অথবা ঘোড়া বাছাই হোক, সিন্ধিয়া রা ওটা বরাবরই ভাল জানেন।
চলমান ইতিহাসের ফুটনোট হিসেবে একটা কথা বলা যাক। কিছুদিন আগে ইন্দোরে ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ এর মূর্তি উদ্বোধন করতে গিয়ে জনতার তাড়া খেয়েছেন, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার পিসি বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া।
টের পেয়েছেন ওই স্লোগানটার মানে। সব কুছ ইয়াদ রাখখা জায়েগা। ( লেখক বিশিষ্ট রাজনৈতিক সাংবাদিক, বিশ্লেষক ) 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button